Search This Blog

Friday, 30 June 2017

তিনটে অর্ধেক দিন আর একটা ব্যস্ত শহর- ৩!!

গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া
 মঙ্গলে উষা,  বুধে পা, যথা খুশি তথা যা! আবার মানকুর্দ, আবার  ট্রেন; এবার  উল্টো দিকে, ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস ! ট্রেনে সময় লাগে এক ঘন্টা মতো..তার পর লাল রঙের ডাবল ডেকার বাসে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া; যথারীতি ট্যুরিস্টের ভিড়, মোবাইল ,dslr এর ক্লিক ক্লিক। পিছন ফিরে এক ঝলক দেখে নেওয়া তাজ হোটেল, তার পর পায়ে হেঁটে মেরিন ড্রাইভ; প্রথমবার ঠিকঠাক ভাবে চোখাচোখি আরবসাগরের সাথে!




 মেরিন ড্রাইভ সুন্দর, মেরিন ড্রাইভ ব্যস্ত কিন্তু বিলাসবহুলভাবে অলস ,মেরিন ড্রাইভ সকলের! কলেজ পালানো প্রেমিক প্রেমিকার ভিড়ে একলা বসে নিজের লোহা বাঁধানো ছড়ির মাথায় হাত বুলোচ্ছেন ষাটোর্দ্ধ বৃদ্ধ; অতিসাহসী ২০-২২ বাঁধানো সিমেন্ট ছেড়ে গিয়ে বসছে পাথরের বোল্ডারে! পাশের চওড়া ফুটপাথে এলোমেলো ঘুরছে কেউ, কেউ বা স্বাস্থ্যসন্ধানের উদ্দেশ্যে হালকা জগিং!  ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৭ টা ছুঁইছুঁই , সূয্যি বসেছেন পাটে!  গম্ভীর সমুদ্র দূরে লালে লাল, আলতো পায়ে অলস সন্ধ্যে নেমে আসে   ব্যস্ত শহরের বুকে!

মেরিন ড্রাইভ-সান্ধ্য আলস্য
 পরের দিন আর বাস-ট্রেন নয়, সময় বাঁচাতে  কালি -পিলি ট্যাক্সি চড়ে জুহু! এদিনটা কনফারেন্সের শেষদিন, আমার বন্ধু আজ আর নেই আমার সাথে, সে ইতিমধ্যেই বিদায় জানিয়েছে মুম্বাইকে! আজ পুরোপুরি একলা চলো রে!

জুহু -ঢেউ এর কাটাকুটি
জুহু-সূর্যাস্ত
জুহুতে পা শখ মিটিয়ে পা ভেজানো সমুদ্রের জলে, বালির উপরে বালি জমিয়ে একলাই প্রাসাদ গড়ার খেলা! আবার দেখা শান্ত সূর্যাস্ত, আবার মানুষের ভিড়ে একলা হয়ে যাওয়া। জুহু যাওয়ার সময় গেছিলাম সমুদ্রের ধার বরাবর; ফেরার পথে শহরের বুক চিরে! মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ট্রাফিক একটু সমস্যা করলেও, 'আকেলি লড়কি' কে অতি যত্নের সাথে তার গন্তব্যে  ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এইবারকার কালি -পিলি'র  ড্রাইভারদাদা!




সানিয়ার সাথে

 জুহু থেকে সানিয়ার জন্যে একটা সাকা লাকা বুম বুম মার্কা পেন্সিল কিনে এনেছিলাম, নতুন বন্ধুত্বের স্মৃতি হিসেবে, ফিরে দেখি, সেও আমার জন্যে নিয়ে এসেছে উপহার!



আর কি! এইবার ফেরা! ফেরারও গল্প আছে, যেমন ছিল যাওয়ারও, কিন্তু সে অন্যকোনোখানে, অন্য কোনো দিন! তিনটে অর্ধেক দিন এইখানেই শেষ, আর 'ব্যস্ত' শহরকে  বিদায়! হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও যে শহরে  আলসেমির অসংখ্য মুহুর্ত ধরা দেয়, যদি খুঁজে নিতে পারেন!

তিনটে অর্ধেক দিন আর একটা ব্যস্ত শহর- ২!!


IISER এ আমার দিন শুরু হয় বেলা ১২টায়। ১২টায় উঠে বিমলদার হাতের এককাপ চা..তার পর অন্য কিছু! এদিকে কনফারেন্স এর শুরু সকাল ৯টায়; তারও আগে ফ্রি ব্রেক-ফাস্ট!  সেমিনার এ দুই-একখান 'talk' না শুনলে খেতি তেমন নেই, কিন্তু পেট পুজো একবেলাও ফাঁকি গেলে  বড়োই দুঃখ হয়!(আশা করি বেশিরভাগ বন্ধুরই সমর্থন পাবো এব্যাপারে 😋😋😋😋😋😁) সুতরাং আগের দিনই আমার নতুন বন্ধু তথা  এখানকার roommate  কে বলে রেখেছিলাম ডেকে দিতে! সানিয়া, আমার roommate হলো সেই ফার্স্ট বেঞ্চের ফার্স্ট গার্ল! ১০টায় ঘুমিয়ে ৬টায় ওঠে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, রাত্তিরে নিয়ম করে অন্তত  এক ঘন্টা পড়াশুনো করে এবং পৃথিবীর সবথেকে বোরিং লেকচারেও খাতা ভর্তি করে নোটস নেয়! কিন্তু  ভাগ্যিস ও এইরকম! যতদিন ছিলাম এখানে, ওই রোজ সকালে দায়িত্ব নিয়ে আমায় ঘুম থেকে তুলেছে।

প্রথম দিন কোথাও যাওয়া হয় নি; আজ তাই ঠিক করে রেখেছিলাম যে কোথাও তো যাবই ! কিন্তু কোথায় সেটাই ছিল প্রশ্ন! দূরে কোথাও যেতে গেলে যে সময়ে বেরোতে হবে, সেই সময় আজ নেই (আমার নিজের PhD গাইড এর talk দিনের শেষ বেলায়, সুতরাং বিধি বাম !); কাছাকাছি কোথায় যাওয়া যেতে পারে কিনা কোনো ধারণা নেই! প্রায় ধরেই নিয়েছি আজকের দিনটাও খরচের খাতায়, এমন সময় IISER এরই এক বন্ধু প্র্রস্তাব দিলো পরের স্টেশন থেকে ঘুরে আসা যেতে পারে, যাত্রাপথে রয়েছে এক অদ্ভুত চমক!

BARC থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ, মানকুর্দ স্টেশন; মুম্বাই CST 'র হারবার লাইনে এই স্টেশন; CST'র উল্টো দিকে গেলে পরের স্টেশন বাসি। ট্রেনে ভিড় খুব একটা নেই, হয়তো স্রোতের উল্টো দিকে যাচ্ছি বলেই! দুই স্টেশনের মধ্যে দশ মিনিট আর এক সমুদ্র ব্যবধান! না , ভুল পড়েন নি, সত্যিই এক সমুদ্র ব্যবধান! ট্রেন লাইন পাতা মুম্বাই শহরে ঢুকে আসা আরব সাগরের বুকের উপর দিয়ে!! চলন্ত ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের নোনতা হাওয়ার আলগা স্পর্শ, সারা দিন কমপ্লেক্স কোয়ান্টাম সিস্টেম নিয়ে আলোচনায় ক্লান্ত মন এক নিমেষে তরতাজা!

source-google map
অপটু হাতে ট্রেন থেকে তোলা ছবি..

 বাসি স্টেশনে নেমে দুজনে 'বড়া পাও'এর সন্ধানে এগোলাম। এদিনের বাকি গল্পটা পেট পুজোরই! বড়া পাও, দাভিলি, এবং 'naturals' এর সবেদা স্বাদের অনবদ্য আইসক্রিম! কিন্তু ওই  গল্পে না যাওয়াই ভালো, সামনে থিসিস প্রেজেন্টেশন আছে, এই সময় পেট খারাপ হলে অবধারিত fail !!

বাকি রইলো মেরিন-ড্রাইভ, জুহু, গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া আর শেষ দিনের অপ্রত্যাশিতভাবে ভাগ্যদেবীর আমার উপর কৃপা বর্ষণ এর কথা বলা! যাহ ! নয় নয় করে প্রায় সবই বাকি রয়ে গেলো দেখি! বলবো আরেকদিন! আজ এইটুকুই থাক!

তিনটে অর্ধেক দিন আর একটা ব্যস্ত শহর-১!!


শুনেছিলাম ভীষণ ব্যস্ত শহর! শুনেছিলাম আছে শুধু আকাশচুম্বী বহুতল! শুনেছিলাম আরও কত্ত কি! ট্রেনে  নাকি 'লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল' মার্কা ভীড়!(যে বন্ধুর থেকে ধার করা কথা, সে এই লেখা পড়বে না, তাই কথাটা নিজের বলে চালিয়ে দিতে অসুবিধা নেই 😀!!) দেখে এলাম, নিজের চোখে! 'bombain'-the good little bay... অধুনা মুম্বাই!!

গেছিলাম কাজেই; কিন্তু কাজের চাইতে 'বিনা কাজের সেবা'তেই কাটিয়ে এসেছি পাঁচটা দিন। 'কালিপিলি' ট্যাক্সি চড়ার উপদেশ আমার সদ্য মুম্বাই ফেরত বন্ধু দিয়েই দিয়েছিলো; 'অনেক কিছু অজানা তথ্য পাওয়া যেতে পারে যদি ড্রাইভার এর সাথে গল্প জুড়ে দিতে পারিস'...কাজেই আকাশ থেকে মাটিতে নেমেই হলুদ-কালো ট্যাক্সির সন্ধান! ড্রাইভার কিন্তু 'মুম্বাইকর' নন! উত্তরপ্রদেশের ব্রাহ্মণ সন্তান! কিন্তু পঁয়ত্রিশ বছর ধরে মুম্বাইতেই ট্যাক্সি চালিয়ে খাচ্ছেন! আমার নাম-গোত্র জেনে আমায় বরাভয় দান করলেন, একলা মেয়ে হলেও ভয়ের কিছু নেই,  আমি যেহেতু বামুনের মেয়ে,উনি কোনো  এক্সট্রা টাকা না নিয়েই  আমায় পৌঁছে দেবেন BARC !বামুনের মেয়ে হিসেবে গর্ব বোধ করব নাকি দেশের অবস্থা দেখে দুঃখ পাবো বুঝতে না পেরে, শেষ অবধি ঠিক করে নিলাম ভিন দেশে সদ্য পা রেখেই বাপ্ ঠাকুরদার সুবাদে পাওয়া এই এক্সট্রা সুবিধাটুকু একটু তারিয়ে উপভোগই করে নি নাহয়!!
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক! আমার প্রিপেইড বুক করা ট্যাক্সির ব্রাহ্মণ ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামানোর  পর বকশিস চেয়েই নিলেন, জাতভাইকে আর বিদেশ বিভুঁইতে বিমুখ না করে আমিও পঞ্চাশটাকার একখানা নোটকে বিদায় জানালাম!

কথায় বলে, তুমি যাও বঙ্গে,কপাল যায় সঙ্গে ! আমার ফাটা কপাল যে আমার সাথে বঙ্গ ছেড়ে আরবসাগর পাড়ি দেবে তা কে জানতো! পাঁচদিনের প্রত্থমদিনটাতেই ফোনের চার্জার গেলো খারাপ হয়ে! এই লক্ষীছাড়ার দেশে আবার সোমবারে বৃহস্পতিবার! BARC এর ভিতর এবং কাছাকাছি সব দোকান বন্ধ! সোমবার দোকান বন্ধ থাকে এখানে! এদিকে আমার হাতে কাজও নেই তেমন, চার্জার  খানারও দরকার!! বিকেল একটু  পড়ে এলে বেরোলাম , চার্জার কেনার লক্ষ্যে।

১০ তলার অন্য বারান্দায়!
আমার ১০তলার বারান্দা থেকে

অনুশক্তিনগর, যেখানে আমি ছিলাম , কেউ বলে না দিলে আপনি বিশ্বাসই  করবেন না যে আপনি মুম্বাইতে আছেন! ফোনের টাওয়ার লাগে না, 3g ইন্টারনেটপাওয়া তো  কল্পনার অতীত! পশ্চিমবাংলার যেকোনো সাধারণ মফঃস্বল শহরে এই জায়গার থেকে বেশি আওয়াজ শুনতে পাবেন আপনি, বেশি জীবন পাবেন! কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা আর পরিচ্ছন্নতায় পাহাড়ের কোলের উপর এই শহর অতুলনীয়! মুম্বাইয়ের ব্যস্ততার গল্প শুনে গেছিলাম, থেকে এলাম চরম শান্তি আর নীরবতার মধ্যে! মুম্বাইয়ের মধ্যে একটুকরো অমুম্বাইসুলভ নিশ্চিন্দিপুর!

প্রথমদিনের গল্পে আর বেশি কিছু নেই, রথ দেখা এবং, বেশি গুরুত্বপূর্ণ , কলা বেচার শুরু পরের দিন থেকে; ব্যস্ত শহরের শ্রান্ত বিকেলের গল্প, রাখে হরি মারে কে'র গল্প!

আস্তে আস্তে হবে খন!

উড়ান

                   
রাইটভাইদের কল্যানে মানুষের উড়তে আজকাল আর কোনো সমস্যা নেই; পকেটে সামান্য একটু বেশি  টাকা অথবা একটু কম সময়, যে দুটোর একটারও তেমন অভাব নেই এই জেট যুগে, থাকলেই মানুষ এখন উড়তে পারে! কিন্তু তবু 'থাকতো যদি নিজের দুটো ডানা'! ডানার অভাবে প্যারাসুটই বা মন্দ কি!

গিয়েছিলাম হিমাচল, মানালি। পাহাড়ের কোলে এই শৈলশহর ভ্রমণবিলাসী বাঙালির অতিচেনা ছুটি কাটাবার ঠিকানা। মানালি থেকে ১৩ কিমি দূরত্বে পর্বত বেষ্টিত জমজমাট উপত্যকা 'সোলাং' ; জমজমাট, কারণ হিমাচল পর্যটনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  একটি স্পট এই সোলাং ভ্যালি।  একই নামের একটি গ্রাম আর  সিন্ধুর উপনদী বিয়াস এর উৎস 'বিয়াস কুন্ড' এর ঠিক মাঝখানে এই উপত্যকা বসে আছে  চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য নিয়ে! চারপাশের পাহাড়  (নাকি পর্বত!) গুলোর মাথায় বরফের  মুকুট,রোদ  ঠিকরে ঝলমল করছে। কিন্তু শুধু এইটুকু নয় সোলাং এর আকর্ষণ, সোলাং আপনাকে দিতে পারে মুক্তির সত্যিকারের আনন্দ- ডানা  মেলে নাহোক, প্যারাসুটের ভরসাতেই সামান্য সময়ের জন্যে আকাশটাকে নিজের করে নেওয়ার সুযোগ দেয় সোলাং, অবশ্য পকেটের আর কলজের, দুটোরই জোর থাকা চাই!
                                    
সোলাং ভ্যালিতে সুযোগ রয়েছে 'প্যারাগ্লাইডিং' করার। সাহসে ভর করে 'বোতাম আটা জামার নিচে শান্তিতে' শুয়ে থাকা প্রানটাকে একটু ধড়ফড়িয়ে আরাম পাওয়ার সুযোগ করে দিলাম। সোলাং -এ ভ্যালি থেকে প্রায় পনেরোতলা উচ্চতায় পাহাড়ের  গায়ে রয়েছে সুন্দর  প্রশস্ত ঢাল , ফেব্রুয়ারির দিকে বরফ জমলে  যেখানে স্কিইং হয়; এই জুন মাসে সেখানে শুধুই সবুজ ঘাসের সমারোহ!

যাই হোক, রোপওয়ে করে সেই উঁচু ঢালের মাথায় পৌঁছে যাওয়া গেলো। সঙ্গে ছিল গাইড দেব।  রোপওয়েতে বসে দেবের সাথে গল্প জুড়েছিলাম; দেবের বাড়ি কাছেই একটা পাহাড়ি গ্রামে, ছোট থেকেই উড়তে ভালোবাসে ও। পনেরো বছর কেটে গেছে বছর তিরিশের দেবের আকাশের নেশায়। ভারতবর্ষে যেখানে যেখানে প্যারাগ্লাইডিং হয় দেবের সব ঘোরা। প্যারাগ্লাইডিং-এর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপেও গেছে ও।  নেপালে একটা দীর্ঘ উড়ানের রেকর্ডও আছে। আপাতত নিজের ওড়ায় বিরতি রেখে আমাদের মতো পর্যটকদের  সখের ওড়ার সাধ মেটাচ্ছে দেব। দেবের থেকেই জানতে পারলাম আশে-পাশের বরফমোড়া চূড়া গুলোর নাম। রোপওয়ে সেন্টার থেকে ভ্যালির দিকে মুখ করে দাঁড়ালে সর্ববামে 'ফ্রেন্ডশিপ', তার ডানপাশে তালসু। তালসুর পরে অপেক্ষাকৃত নিচু একটা জঙ্গলাবৃত পাহাড়ের আড়ালে ঢেকে যাওয়া 'রোটাং'; তার ডানদিকে 'ভৃগুলা'; যেখানে রয়েছে  বিখ্যাত ভৃগু লেক। দেব অবশ্য আমার গাইড ছিল না, সে আমায় অপেক্ষায় রেখে আমার সঙ্গিনীকে নিয়ে উড়ে গেলো।
আমার গাইড এর নাম ভোলে! আমি দাঁড়িয়ে আছি উড়ান শুরুর অপেক্ষায়, ভোলেবাবার পাত্তা নেই! আমার আগে অন্তত পাঁচজন উড়ে গেলো প্যারাসুটে প্যারাসাইট হয়ে, কে বলে শিব আশুতোষ! দাঁড়িয়ে বিরক্ত হতে হতে এক বাঙালিকে দেখে গল্প জুড়েছি, ঝাঁকড়া চুল আর এক কানে দুল পরে আধুনিক ভোলে হাজির, হাতে অর্ধেকটা শেষ হয়ে যাওয়া ফ্লেক!
হাতে ,হাঁটুতে বুকে এবং কোমরে বেল্ট পরিয়ে দিলো দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, যারা শুরু থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় হেলমেট। তারপর পিঠে লাগিয়ে দিলো ব্যাগ-চেয়ার! আদতে চেয়ার , কিন্তু লাগাতে হয় ব্যাগের মতো করে! হলুদ-কমলা প্যারাসুট ঢালের ওপর বিছিয়ে দিয়েছিলো ওরা, তার দুটো দড়ি লাগিয়ে দিলো পিঠে, একই ভাবে 'রণসজ্জা'য় সেজে নিলো ভোলেও ; সে থাকবে একই প্যারাসুটে, আমার পিছনে! পার্থক্য এইটুকু যে ওর হাতে নিয়ন্ত্রণ , আর আমি নাচের পুতুল মাত্র!


তারপরে সাবধানে 'রানওয়ে' বেয়ে অল্প ছুটে নেমে আসা; উত্তেজনা আর বুক ঢিপঢিপ মিলে মনের অবস্থা অবর্ণনীয়! ঢালের শেষে পা তুলে ব্যাগ চেয়ার-এ বসে যাও, সেইটাই টেক -অফ! পিছনে সদাশিবের হাতে জীবন-মরনের দড়ি, ভয়ের কি আছে! ভোলে বছর সাতেক হলো ফ্লাই করছে! ওর থেকেই শুনলাম ওদেরও  পোশাকি নাম 'পাইলট'! কিন্তু ভোলে  দেবের মতো গল্পুরে নয়! তাই কিছুক্ষন গল্প জমাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে শেষে মন দিলাম আকাশে! একদিকে ভালোই হলো! ৩২০০ খরচ করে ১০ মিনিটের জন্য আকাশ কিনেছি, একটু দেখে নেবো না!

আমরা টেক-অফের পর আরও খানিকটা উঠে থিতু ছিলাম খানিকক্ষণ আকাশে, মনে হচ্ছিলো ওই দূরে সোনা রং ঠিকরে পড়ছে যে বরফের চূড়া গুলো থেকে, যেগুলোর নাম দেব একটু আগেই বলেছে আমায়, ওগুলোর সমান উঁচুতে ভাসছি! ঠান্ডা হাওয়ায় মন শিরশিরিয়ে উঠছে, তবে তার জন্যে শীত না আড্রেনালিন কে দায়ী তার খবর কে রাখে! নিচের দিকে তাকালাম, অনেক অনেক নিচে পুতুলেরবাড়ি দিয়ে সাজানো   ছোট্ট একটা গ্রাম, সরু ফিতের মতো সবুজ-নীলের মাঝে সাদা হয়ে বইছে বিয়াস! অন্য পাশে সোলাং ভ্যালিকে চিনতে পারছি পাশের রাস্তা আর তাতে জমা হওয়া অসংখ্য খেলনা গাড়ি দেখে!
দেখে আশ মিটছে না, আশ-পাশে  ফিরে ফিরে তাকাচ্ছি, হঠাৎ দড়িতে টান! আকাশের মধ্যে উলুটি-পালুটি খাওয়াচ্ছে আমায় আমার পাইলট!সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে ভোলের আমার এবং আমাদের প্যারাসুটের উপর, কিন্তু প্রত্যেকবার বাঁক নেওয়ার আগে এক-মুহূর্তের জন্যে সে ছেড়ে দিচ্ছে দড়ির উপর তার শাসন, পরের মুহূর্তেই আরও একটু বেশি করে শাসন কায়েমী করবে বলে, কিন্তু সেই একটা সেকেন্ড যথেষ্ট ছেলেবেলা থেকে পড়ে আসা অভিকর্ষের বল অনুভব করার
জন্যে! এক সেকেন্ডের জন্যে মনে হচ্ছে 'ফ্রি ফল' জিনিসটা কি, এইবার হাড়ে হাড়ে টের পাবো! কিন্তু ভয় না, সেই সময়ের একমাত্র অনুভূতি যা টের পাচ্ছি শরীর ও মনে, তা হলো উত্তেজনা, নিখাদ উত্তেজনা!

ওলোট-পালটের পালা মিটলে দশ মিনিটের বাকিটা ভোলে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে দেখিয়ে বেড়ালো বরফ, পাহাড়ি ঝর্ণা, তার গ্রাম, রাস্তা, পাইনএর জঙ্গল। তার পর সময় শেষ হতে সাবধানে সোলাং-ভ্যালিতে প্রত্যাবর্তন, নরম মাটিতে পা
ছড়িয়ে দিয়ে বসে যাওয়া! দশ মিনিট সময়টা এত তাড়াতাড়ি  জীবনে কখনো কাটেনি! মাটিতে ফিরে প্রথম মনে হয়েছিল আবার ফিরে যাই আকাশে! আর একবার ঘুরে আসি মেঘের মধ্যে, মেঘনাদ হয়ে! কিন্তু পকেটের কথা ভেবে নিরস্ত করলাম মনকে, অতিকষ্টে!

আকাশটা ধরা দিলো বটে, তবে আশ মিটলো না!