রাইটভাইদের কল্যানে মানুষের উড়তে আজকাল আর কোনো সমস্যা নেই; পকেটে সামান্য একটু বেশি টাকা অথবা একটু কম সময়, যে দুটোর একটারও তেমন অভাব নেই এই জেট যুগে, থাকলেই মানুষ এখন উড়তে পারে! কিন্তু তবু 'থাকতো যদি নিজের দুটো ডানা'! ডানার অভাবে প্যারাসুটই বা মন্দ কি!
গিয়েছিলাম হিমাচল, মানালি। পাহাড়ের কোলে এই শৈলশহর ভ্রমণবিলাসী বাঙালির অতিচেনা ছুটি কাটাবার ঠিকানা। মানালি থেকে ১৩ কিমি দূরত্বে পর্বত বেষ্টিত জমজমাট উপত্যকা '
সোলাং' ; জমজমাট, কারণ হিমাচল পর্যটনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্পট এই সোলাং ভ্যালি। একই নামের একটি গ্রাম আর সিন্ধুর উপনদী বিয়াস এর উৎস 'বিয়াস কুন্ড' এর ঠিক মাঝখানে এই উপত্যকা বসে আছে চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য নিয়ে! চারপাশের পাহাড় (নাকি পর্বত!) গুলোর মাথায় বরফের মুকুট,রোদ ঠিকরে ঝলমল করছে। কিন্তু শুধু এইটুকু নয় সোলাং এর আকর্ষণ, সোলাং আপনাকে দিতে পারে মুক্তির সত্যিকারের আনন্দ- ডানা মেলে নাহোক, প্যারাসুটের ভরসাতেই সামান্য সময়ের জন্যে আকাশটাকে নিজের করে নেওয়ার সুযোগ দেয় সোলাং, অবশ্য পকেটের আর কলজের, দুটোরই জোর থাকা চাই!
সোলাং ভ্যালিতে সুযোগ রয়েছে 'প্যারাগ্লাইডিং' করার। সাহসে ভর করে 'বোতাম আটা জামার নিচে শান্তিতে' শুয়ে থাকা প্রানটাকে একটু ধড়ফড়িয়ে আরাম পাওয়ার সুযোগ করে দিলাম। সোলাং -এ ভ্যালি থেকে প্রায় পনেরোতলা উচ্চতায় পাহাড়ের গায়ে রয়েছে সুন্দর প্রশস্ত ঢাল , ফেব্রুয়ারির দিকে বরফ জমলে যেখানে স্কিইং হয়; এই জুন মাসে সেখানে শুধুই সবুজ ঘাসের সমারোহ!
যাই হোক, রোপওয়ে করে সেই উঁচু ঢালের মাথায় পৌঁছে যাওয়া গেলো। সঙ্গে ছিল গাইড দেব। রোপওয়েতে বসে দেবের সাথে গল্প জুড়েছিলাম; দেবের বাড়ি কাছেই একটা পাহাড়ি গ্রামে, ছোট থেকেই উড়তে ভালোবাসে ও। পনেরো বছর কেটে গেছে বছর তিরিশের দেবের আকাশের নেশায়। ভারতবর্ষে যেখানে যেখানে প্যারাগ্লাইডিং হয় দেবের সব ঘোরা। প্যারাগ্লাইডিং-এর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপেও গেছে ও। নেপালে একটা দীর্ঘ উড়ানের রেকর্ডও আছে। আপাতত নিজের ওড়ায় বিরতি রেখে আমাদের মতো পর্যটকদের সখের ওড়ার সাধ মেটাচ্ছে দেব। দেবের থেকেই জানতে পারলাম আশে-পাশের বরফমোড়া চূড়া গুলোর নাম। রোপওয়ে সেন্টার থেকে ভ্যালির দিকে মুখ করে দাঁড়ালে সর্ববামে 'ফ্রেন্ডশিপ', তার ডানপাশে তালসু। তালসুর পরে অপেক্ষাকৃত নিচু একটা জঙ্গলাবৃত পাহাড়ের আড়ালে ঢেকে যাওয়া 'রোটাং'; তার ডানদিকে 'ভৃগুলা'; যেখানে রয়েছে বিখ্যাত ভৃগু লেক। দেব অবশ্য আমার গাইড ছিল না, সে আমায় অপেক্ষায় রেখে আমার সঙ্গিনীকে নিয়ে উড়ে গেলো।
আমার গাইড এর নাম ভোলে! আমি দাঁড়িয়ে আছি উড়ান শুরুর অপেক্ষায়, ভোলেবাবার পাত্তা নেই! আমার আগে অন্তত পাঁচজন উড়ে গেলো প্যারাসুটে প্যারাসাইট হয়ে, কে বলে শিব আশুতোষ! দাঁড়িয়ে বিরক্ত হতে হতে এক বাঙালিকে দেখে গল্প জুড়েছি, ঝাঁকড়া চুল আর এক কানে দুল পরে আধুনিক ভোলে হাজির, হাতে অর্ধেকটা শেষ হয়ে যাওয়া ফ্লেক!

হাতে ,হাঁটুতে বুকে এবং কোমরে বেল্ট পরিয়ে দিলো দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, যারা শুরু থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় হেলমেট। তারপর পিঠে লাগিয়ে দিলো ব্যাগ-চেয়ার! আদতে চেয়ার , কিন্তু লাগাতে হয় ব্যাগের মতো করে! হলুদ-কমলা প্যারাসুট ঢালের ওপর বিছিয়ে দিয়েছিলো ওরা, তার দুটো দড়ি লাগিয়ে দিলো পিঠে, একই ভাবে 'রণসজ্জা'য় সেজে নিলো ভোলেও ; সে থাকবে একই প্যারাসুটে, আমার পিছনে! পার্থক্য এইটুকু যে ওর হাতে নিয়ন্ত্রণ , আর আমি নাচের পুতুল মাত্র!
তারপরে সাবধানে 'রানওয়ে' বেয়ে অল্প ছুটে নেমে আসা; উত্তেজনা আর বুক ঢিপঢিপ মিলে মনের অবস্থা অবর্ণনীয়! ঢালের শেষে পা তুলে ব্যাগ চেয়ার-এ বসে যাও, সেইটাই টেক -অফ! পিছনে সদাশিবের হাতে জীবন-মরনের দড়ি, ভয়ের কি আছে! ভোলে বছর সাতেক হলো ফ্লাই করছে! ওর থেকেই শুনলাম ওদেরও পোশাকি নাম 'পাইলট'! কিন্তু ভোলে দেবের মতো গল্পুরে নয়! তাই কিছুক্ষন গল্প জমাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে শেষে মন দিলাম আকাশে! একদিকে ভালোই হলো! ৩২০০ খরচ করে ১০ মিনিটের জন্য আকাশ কিনেছি, একটু দেখে নেবো না!
আমরা টেক-অফের পর আরও খানিকটা উঠে থিতু ছিলাম খানিকক্ষণ আকাশে, মনে হচ্ছিলো ওই দূরে সোনা রং ঠিকরে পড়ছে যে বরফের চূড়া গুলো থেকে, যেগুলোর নাম দেব একটু আগেই বলেছে আমায়, ওগুলোর সমান উঁচুতে ভাসছি! ঠান্ডা হাওয়ায় মন শিরশিরিয়ে উঠছে, তবে তার জন্যে শীত না আড্রেনালিন কে দায়ী তার খবর কে রাখে! নিচের দিকে তাকালাম, অনেক অনেক নিচে পুতুলেরবাড়ি দিয়ে সাজানো ছোট্ট একটা গ্রাম, সরু ফিতের মতো সবুজ-নীলের মাঝে সাদা হয়ে বইছে বিয়াস! অন্য পাশে সোলাং ভ্যালিকে চিনতে পারছি পাশের রাস্তা আর তাতে জমা হওয়া অসংখ্য খেলনা গাড়ি দেখে!
দেখে আশ মিটছে না, আশ-পাশে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছি, হঠাৎ দড়িতে টান! আকাশের মধ্যে উলুটি-পালুটি খাওয়াচ্ছে আমায় আমার পাইলট!সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে ভোলের আমার এবং আমাদের প্যারাসুটের উপর, কিন্তু প্রত্যেকবার বাঁক নেওয়ার আগে এক-মুহূর্তের জন্যে সে ছেড়ে দিচ্ছে দড়ির উপর তার শাসন, পরের মুহূর্তেই আরও একটু বেশি করে শাসন কায়েমী করবে বলে, কিন্তু সেই একটা সেকেন্ড যথেষ্ট ছেলেবেলা থেকে পড়ে আসা অভিকর্ষের বল অনুভব করার

জন্যে! এক সেকেন্ডের জন্যে মনে হচ্ছে 'ফ্রি ফল' জিনিসটা কি, এইবার হাড়ে হাড়ে টের পাবো! কিন্তু ভয় না, সেই সময়ের একমাত্র অনুভূতি যা টের পাচ্ছি শরীর ও মনে, তা হলো উত্তেজনা, নিখাদ উত্তেজনা!
ওলোট-পালটের পালা মিটলে দশ মিনিটের বাকিটা ভোলে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে দেখিয়ে বেড়ালো বরফ, পাহাড়ি ঝর্ণা, তার গ্রাম, রাস্তা, পাইনএর জঙ্গল। তার পর সময় শেষ হতে সাবধানে সোলাং-ভ্যালিতে প্রত্যাবর্তন, নরম মাটিতে পা
ছড়িয়ে দিয়ে বসে যাওয়া! দশ মিনিট সময়টা এত তাড়াতাড়ি জীবনে কখনো কাটেনি! মাটিতে ফিরে প্রথম মনে হয়েছিল আবার ফিরে যাই আকাশে! আর একবার ঘুরে আসি মেঘের মধ্যে, মেঘনাদ হয়ে! কিন্তু পকেটের কথা ভেবে নিরস্ত করলাম মনকে, অতিকষ্টে!
আকাশটা ধরা দিলো বটে, তবে আশ মিটলো না!